সমাস

সংগাঃ সমাস শব্দের অর্থ সংক্ষেপন। একাধিক পদের একপদীকরণ। দুই বা ততোধিক পদের মধ্যস্থিত অব্যয় প্রভৃতি লোপ পেয়ে একপদ হওয়াকে সমাস বলে। একাধিক পদ একসাথে যুক্ত হয়ে সমাসে একটি নতুন শব্দ গঠিত হয়। বাক্যে শব্দের ব্যবহার সংক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে সমাসের সৃষ্টি। সমাসের রীতি সংস্কৃত থেকে বাংলায় এসেছে।
উদাহরণঃ রাজার কুমার = রাজকুমার, সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন।
সমাস ৬ প্রকারঃ
১। দ্বন্দ্ব সমাস
২। দ্বিগু সমাস
৩। কর্মধারয় সমাস
৪। তৎপুরুষ সমাস।
৫। অব্যয়ীভাব সমাস।
৬। বহুব্রীহি সমাস।

সমাস চেনার উপায়ঃ

সমাস চেনার উপায় উদাহরণ
দ্বন্দ্ব উভয়পদ প্রধান বাবা-মা, দেশ-বিদেশ
দ্বিগু পরপদ প্রধান, পূর্বপদে সংখ্যা থাকবে ত্রিফলা, শতাব্দী
কর্মধারয় পরপদ প্রধান, তুলনা বোঝাবে, ব্যাসবাক্যে
যে / যিনি / যারা থাকবে
কাজলকালো, চালাকচতুর
তৎপুরুষ পরপদ প্রধান, মাঝে বিভক্তি থাকবে দ্বিতীয়া
থেকে সপ্তমী
রথদেখা (রথকে দেখা)
অব্যয়ীভাব পূর্বপদ প্রধান দুর্ণীতি
বহুব্রীহি দুই পদ মিলে নতুন একটি পদ হয় ব্যাসবাক্যের শেষে ’যার’ থাকে বীণাপানি (বীণা পানিতে যার) স্বরস্বতী

দ্বন্দ্ব সমাসঃদ্বন্দ্ব শব্দের অর্থ যুগ্ন বা জোড়া। যে সমাসে পূর্বপদ এবং পরপদ উভয়েরই প্রাধান্য থাকে তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। দ্বন্দ্ব সমাসে পূর্ব ও পরপদের সম্বন্ধ স্থাপনে ও, এবং, আর এই তিনটি অব্যয় ব্যবহৃত হয়। যেমন- মা ও বাপ = মা-বাপ, অন্ন ও বস্ত্র = অন্নবস্ত্র ।
দ্বন্দ্ব সমাস কয়েক প্রকারে গঠিত হয়ঃ
১। সমার্থক শব্দযোগেঃ হাট-বাজার, ঘর-দুয়ার, কাজ-কর্ম।
২। বিপরীতার্থক শব্দযোগেঃ আয়-ব্যায়, জমা-খরচ, দিন-রাত।
৩। মিলনার্থক শব্দযোগেঃ মা-বাপ, মাসি-পিসি, চাল-ডাল।
৪। বিরোধার্তক শব্দযোগেঃ দা-কুমড়া, অহি-নকুল।
৫। অঙ্গবাচকঃ হাত-পা, বুক-পিঠ, মাথা-মুন্ডু।
৬। সংখ্যাবাচকঃ সাত-পাঁচ, নয়-ছয়, উনিশ-বিশ।
৭। দু’টি সর্বনাম যোগেঃ যা-তা, যে-সে, যথা-তথা।
৮। দু’টি ক্রিয়াযোগেঃ দেখা-শোনা, যাওয়া-আসা, চলা-ফেরা।
৯। দু’টি বিশেষন যোগেঃ ভালো-মন্দ, কম-বেশী, আসল-নকল।
১০। দু’টি ক্রিয়া বিশেষন যোগেঃ ধীরে-সুস্থে, আগে-পাছে।

অলুক দ্বন্দ্বঃ যে দ্বন্দ্বে কোন সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ পায়না, তাকে অলুক দ্বন্দ্ব বলে। যেমন- দুধে-ভাতে, জলে-স্থলে, দেশে-বিদেশে।
বহুপদী দ্বন্দ্বঃ তিন বা বহুপদে দ্বন্দ্ব সমাস হলে তাকে বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন- সাহেব-বিবি-গোলাম, হাত-পা-নাখ- মুখ-কান।

দ্বিগু সমাসঃ মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য পদের যে সমাস হয়, তাই দ্বিগু সমাস। এখানে দ্বিগু সমাস বিশেষনের সঙ্গে বিশেষ্য পদে হয় এবং পরপদের অর্থই প্রাধান্য পায়।
যেমন- তিন কালের সমাহার = ত্রিকাল, শত অব্দের সমাহার = শতাব্দী।
কর্মধারয় সমাসঃ যে সমাসে বিশেষন বা বিশেষন ভাবাপন্ন পদ এবং বিশেষ্য বা বিশেষ্য ভাবাপন্ন পদ, পূর্বপদ ও পরপদ হয়ে পরপদের প্রাধান্য বিস্তার করে এবং পূর্বপদের সাথে তুলনা নির্দেশ করে তাকে কর্মধারয় সমাস বলে।
যেমন- নীল যে পদ্ম = নীলপদ্ম, কাজলের ন্যায় কালো = কাজলকালো।
কর্মধারয় সমাসের প্রকারভেদঃ
১। মধ্যপদলোপী কর্মধারয়ঃ যে কর্মধারয় সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যপদের লোপ হয়, তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলে। যেমনঃ সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন, সাহিত্য বিষয়ক সভা = সাহিত্যসভা।
২। উপমান কর্মধারয়ঃ প্রত্যক্ষ কোন বস্তুর সাথে পরোক্ষ কোন বস্তুর তুলনা করলে প্রত্যক্ষ বস্তুটিকে বলা হয় উপমেয়, আর যার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে তাকে বলা হয় উপমান।
যেমন- অরুণের ন্যায় রাঙা প্রভাত = অরুণরাঙা প্রভাত। এখানে প্রভাতকে অরুণের মত রাঙা বলে তুলনা করা হয়েছে। সুতরাং এখানে প্রভাত উপমেয়। উপমান হল অরুণ। আর প্রভাত ও অরুণের সাধারন ধর্ম হল রাঙা।
তুষারের ন্যায় শুভ্র = তুষারশুভ্র।
৩। উপমিত কর্মধারয়ঃ উপমেয় পদের সাথে উপমানের যে সমাস হয় তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে।
যেমন- মুখ চন্দ্রের ন্যায় = চন্দ্রমুখ, পুরুষ সিংহের ন্যায় = সিংহপুরুষ।
৪। রূপক কর্মধারয়ঃ উপমান ও উপমেয়ের মধ্যে অভিন্নতা কল্পনা করা হলে রূপক কর্মধারয় হয়।
যেমন- ক্রোধ রূপ অনল = ক্রোধানল, বিষাধ রূপ সিন্ধু = বিষাধসিন্ধু।
তৎপুরুষ সমাসঃ পূর্বপদের বিভক্তির লোপে এবং পরপদের অর্থ প্রধানভাবে বোঝায়, তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। তৎপুরুষ সমাসের পূর্বপদে দ্বিতীয়া থেকে সপ্তমী পর্যন্ত যে কোন বিভক্তি থাকতে পারে। আর পূর্বপদের বিভক্তি অনুসারে এদের নামকরণ হয়। যেমন- বিপদকে আপন্ন = বিপদাপন্ন। এখানে ’কে’ লোপ পেয়েছে বলে এর নাম দ্বিতীয়া তৎপুরুষ।

  1.  দ্বিতীয়া তৎপুরুষঃ স্বর্গকে গত = স্বর্গগত।
  2.  তৃতীয়া তৎপুরুষঃ রজ্জু দ্বারা বন্ধ = রজ্জুবন্ধ।
  3.  চতুর্থী তৎপুরুষঃ যজ্ঞের নিমিত্ত ভূমি = যজ্ঞভূমি।
  4.  পঞ্চমী তৎপুরুষঃ মুখ হতে ভ্রষ্ট = মুখভ্রষ্ট।
  5.  ষষ্ঠী তৎপুরুষঃ দীনের বন্ধু = দীনবন্ধু।
  6.  সপ্তমী তৎপুরুষঃ ন উক্ত = অনুক্ত।

প্রকারভেদঃ
১। কর্মতৎপুরুষঃ পূর্বপদের কর্মকারকের বিভক্তিচিহ্ন লোপ পায়। যেমন- লুচিকে ভাজা = লুচিভাজা।
২। করণতৎপুরুষঃ পূর্বপদের করণকারকের বিভক্তি (এ, য়, তে) অনুসর্গ (দ্বারা, দিয়া, কতৃক) লোপ পায়। যেমন- আশা দ্বারা আহত = আশাহত।
৩। অপাদান তৎপুরুষ সমাসঃ পূর্বপদের অপাদান কারকের বিভক্তি (এ, তে) / অনুসর্গ (হইতে, থেকে, চেয়ে) লোপ পায়। যেমন- জল হইতে আতঙ্ক = জলাতঙ্ক।
৪। নিমিত্ত তৎপুরুষঃ পূর্বপদের নিমিত্ত / জন্য / উদ্দেশ্য প্রভৃতি নিমিত্তবাচক অংশগুলির লোপ হয়। যেমন- তীর্থের উদ্দেশ্যে যাত্রা = তীর্থযাত্রা।
৫। অধিকরণ তৎপুরুষ সমাসঃ এখানে পূর্বপদের অধিকরণ কারকের বিভক্তিচিহ্ন (এ, য়, তে) লোপ পায়। যেমন- গীতায় উক্ত = গীতোক্ত।
৬। সম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাসঃ এই সমাসে পূর্বপদের সম্বন্ধের বিভক্তিচিহ্ন (র, এর, দের) লোপ পায়। যেমন- মন্ত্রীদের সভা = মন্ত্রীসভা।
অব্যয়ীভাব সমাসঃ পূর্বপদে অব্যয়যোগে নিষ্পন্ন সমাসে যদি অব্যয়েরই অর্থের প্রাধান্য থাকে, তবে তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। যেমন- মরণ পর্যন্ত = আমরণ।
 সামীপ্য অর্থেঃ কন্ঠের সমীপে = উপকন্ঠ, কূলের সমীপে = উপকূল।
 অভাব অর্থেঃ আমিষের অভাব = নিরামিষ, ভাবনার অবাব = নির্ভাবনা।
 পর্যন্ত অর্থেঃ পা থেকে মাথা পর্যন্ত = আপাদমস্তক।
 সাদৃশ্য অর্থেঃ গ্রহের তুল্য = উপগ্রহ, বনের সদৃশ = উপবন।
 পশ্চাৎ অর্থে ঃ পশ্চাৎ ধাবন = অনুধাবন, পশ্চাৎ গমন = অনুগমন।
 ক্ষুদ্র অর্থেঃ উপগ্রহ, উপনদী।
 পূর্ণ বা সমগ্র অর্থেঃ পরিপূর্ণ, সম্পূর্ণ।
 প্রতিনিধি অর্থেঃ প্রতিচ্ছায়া, প্রতিচ্ছবি।
বহুব্রীহি সমাসঃ যে সমাসে সমস্যমান পদগুলির কোনটির অর্থই প্রধানভাবে না বুঝিয়ে অন্য কোন অর্থ প্রথানভাবে বোঝায়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন- বীনা পানিতে যার = বীনাপানি।
প্রকারভেদঃ
১। সমানাধিকরণ বহুব্রীহিঃ পূর্বপদ বিশেষন ও পরপদ বিশেষ্য হয় এ সমাসে। এখানে উভয় পদেই শূন্য বিভক্তি থাকায় এর নাম সমানাধিকরণ। যেমন- ছিন্ন হয়েছে শাখা যার = ছিন্নশাখা(বৃক্ষ)।
২। ব্যাধিকরণ বহুব্রীহিঃ পূর্বপদ ও পরপদ কোনটিই যদি বিশেষন না হয় তবে ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি হয়। বিশেষ্য + বিশেষ্য পদে ব্যাধিকরণ হয়। যেমন- আশীতে (দাঁতে) বিষ যার = আশীবিষ (সাপ)।
৩। ব্যাতিহার বহুব্রীহিঃ ক্রিয়ার পারষ্পারিক অর্থে ব্যাতিহার বহুব্রীহি হয়। এ সমাসে পূর্বপদে ’আ’ এবং পরপদে ’ই’ যুক্ত হয়। যেমন- হাতে হাতে যে যুদ্ধ = হাতাহাতি।
৪। ন ঞ্ বহুব্রীহিঃ বিশেষ্য পূর্বপদের আগে ন ঞ্ (না অর্থবোধক) অব্যয় যুক্ত করে বহুব্রীহি সমাস করা হয়। যেমন- ন (নাই) জ্ঞান যার = অজ্ঞান।
৫। মধ্যপদলোপী বহুব্রীহিঃ বহুব্রীহি সমাসের ব্যাখ্যার জন্য ব্যবহৃত বাক্যাংশের কোন অংশ যদি সমস্তপদে লোপ পায়, তবে তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি বলে। যেমন- বিড়ালের চোখের ন্যায় চোখ যে নারীর = বিড়ালচোখী, হাতে খড়ি দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = হাতেখড়ি।
৬। প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহিঃ যে বহুব্রীহি সমাসের সমস্তপদে আ, এ, ও ইত্যাদি প্রত্যয় যুক্ত হয়, তাকে বলা হয় প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি। যেমন- এক দিকে চোখ (দৃষ্টি) যার = একচোখা (চোখ+আ)।
৭। অলুক বহুব্রীহিঃ যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্ব বা পরপদের কোন পরিবর্তন হয়না, তাকে অলুক বহুব্রীহি বলে। এখানে সমস্ত পদটি বিশেষন হয়। যেমন- মাথায় পাগড়ি যার = মাথায় পাগড়ি।
৮। সংখ্যাবাচক বহুব্রীহিঃ পূর্বপদ সংখ্যাবাচক এবং পরপদ বিশেষ্য হলে এবং সমস্তপদটি বিশেষন বোঝালে তাকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি বলা হয়। যেমন- দশ গজ পরিমান যার = দশগজি, চৌ (চার) চাল যে ঘরের = চৌচালা।
এছাড়াও প্রাদি, নিত্য, উপপদ ও অলুক সমাস রয়েছে।
প্রাদি সমাসঃ প্র, প্রতি, অনু প্রভৃতি অব্যয়ের সঙ্গে যদি কৃৎ প্রত্যয় সাধিত বিশেষ্যের সমাস হয়, তবে তাকে বলে প্রাদি সমাস। যেমন- প্র-যে বচন = প্রবচন, অনুতে যে তাপ = অনুতাপ।
নিত্যসমাসঃ যে সমাসে সমস্যমান পদগুলো নিত্য সমাসবদ্ধ থাকে, ব্যাসবাক্যের দরকার হয়না, তাকে নিত্য সমাস বলে যেমন- অন্য গ্রাম = গ্রামান্তর, কেবল দর্শন = দর্শনমাত্র, অন্য গৃহ = গৃহান্তর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!